জেমসের জীবনের মন্ত্র—‘টেক ইট ইজি’
বিনোদন ডেস্ক
বাংলা রক সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও ‘নগর বাউল’ মাহফুজ আনাম জেমসের জীবনদর্শন খুবই সরল—‘টেক ইট ইজি’, অর্থাৎ জীবনকে সহজভাবে নেওয়া।
জন্মদিন ঘটা করে উদ্যাপন না করলেও ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসায় বিশেষ হয়ে ওঠে জেমসের জন্মদিন। জন্মদিনের আগের বিকেলে পূর্বাচলের একটি ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় নিজের সংগীত, জীবনবোধ, প্রয়াত সহশিল্পী আয়ুব বাচ্চু এবং বর্তমান সংগীতাঙ্গন নিয়ে কথা বলেন তিনি।
‘সংগীত যেদিকে নেয়, সেদিকেই যাই’
গান তৈরির রহস্য সম্পর্কে জেমস জানান, সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে তিনি অতিরিক্ত পরিকল্পনা বা জটিলতার পথে হাঁটেন না। মুহূর্তকে উপভোগ করেই সংগীতের সঙ্গে এগিয়ে যান।
তাঁর মতে, একটি গানের প্রথমে মৌলিক কাঠামো তৈরি হয়। পরে সেটি পরিবর্তন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। তাই মূল ভাবনা ঠিক রেখে গানের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য উন্মুক্ত রাখেন তিনি।
আয়ুব বাচ্চুকে এখনো মনে পড়ে
প্রয়াত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আয়ুব বাচ্চুর প্রসঙ্গ উঠলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেমস। বাচ্চুর সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলা ছিল যেন একটি বই খুলে বসার মতো। কথায় কথায় কখন সময় চলে যেত, তা টেরই পাওয়া যেত না।
বাচ্চুর আকস্মিক মৃত্যুর কথা স্মরণ করে জেমস জানান, এখনো তাঁকে নিয়মিত মনে পড়ে। কখনো কখনো তাঁর ওপর অভিমানও হয়।
হারিয়ে গেছে স্টুডিওর সেই আড্ডা
৮০-এর দশকের সংগীতাঙ্গনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জেমস বলেন, সে সময় শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের একটি চমৎকার সংস্কৃতি ছিল। একজন শিল্পীর রেকর্ডিং চললে অন্যরা স্টুডিওতে গিয়ে পাশে থাকতেন।
আয়ুব বাচ্চুও তাঁর রেকর্ডিংয়ে আসতেন, তিনিও বাচ্চুর রেকর্ডিংয়ে যেতেন। তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সেই সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে বলে মনে করেন জেমস। এখন অনেকেই হোম স্টুডিও ও ল্যাপটপনির্ভর হয়ে পড়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘লাভের জন্য সংগীত করা যায় না’
বর্তমান সংগীতাঙ্গন নিয়ে জেমস বলেন, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে প্রতিভা ও আগ্রহের কোনো ঘাটতি নেই। তবে সংগীতকে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তাঁর মতে, ভালোবাসা ও আবেগ থেকেই সংগীত সৃষ্টি হওয়া উচিত। শুধু লাভের প্রত্যাশা নিয়ে সৃষ্টিশীল কাজ শুরু করলে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কারণে সংগীত এখন মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। মানুষের পুরো একটি গান মনোযোগ দিয়ে শোনার ধৈর্য কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
এআই নিয়ে আপত্তি নেই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন জেমস। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন আসবেই। নতুন প্রজন্ম এআই ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভালো কিছু সৃষ্টি করতে পারলে তা গ্রহণে সমস্যা নেই।
তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
‘সংস্কৃতি নদীর মতো’
সংগীত ও সংস্কৃতির স্বাধীন প্রবাহের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরে জেমস বলেন, গান মানুষের শোনা ও গাওয়ার জন্য। মানুষ বাজারে, নদীর ঘাটে কিংবা যেকোনো জায়গায় গান গাইতে পারে। অযথা এতে বাধা দেওয়া উচিত নয়।
তাঁর ভাষায়, সংস্কৃতি একটি নদীর মতো—তাকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হতে দিতে হয়।
‘সমাজ পরিবর্তন করতে আসিনি, মানুষকে আনন্দ দিতে এসেছি’
শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে জেমস বলেন, সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলা ব্যক্তিগত সচেতনতার বিষয়। নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য—তিনি সমাজ পরিবর্তনের জন্য নয়, মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য শিল্পী হয়েছেন।
তবে প্রত্যেকে যদি নিজের এবং আশপাশের মানুষের ভালো করার চেষ্টা করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের উপকার হবে বলে মনে করেন তিনি।
কোনো অপূর্ণতার আক্ষেপ নেই
জীবন নিয়ে নিজের উপলব্ধি জানাতে গিয়ে জেমস বলেন, জীবনে কী পেয়েছেন আর কী পাননি—এমন হিসাব তিনি কখনো করেননি। অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়েও তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই।
জীবনকে কীভাবে দেখেন—এ প্রশ্নের উত্তরেও তাঁর সহজ দর্শন—
‘টেক ইট ইজি।’
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিদায় নেওয়ার সময় উপস্থিত সবাই তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। গাড়িতে ওঠার আগে সবার দিকে তাকিয়ে হাসেন ‘গুরু’। এরপর তাঁর মুখে শোনা যায় পরিচিত আন্তরিক বিদায়—‘ভালো থাকিস।’
জেমসের জীবনের মন্ত্র—‘টেক ইট ইজি’
প্রকাশ:

