প্রধানমন্ত্রী থেকে কারাগারে: মালয়েশিয়ার সাবেক ক্ষমতাধর নেতা নাজিব রাজাক
কুয়ালালামপুর, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও একসময়কার সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা নাজিব রাজাক বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে কারাবন্দি। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ১এমডিবি (1MDB) কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি বর্তমানে ছয় বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) তার বিরুদ্ধে আরও একটি বড় দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে দোষী সাব্যস্ত হলে তার সাজা আরও বাড়তে পারে।
মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতার সন্তান নাজিব রাজাক ছোটবেলা থেকেই দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি সংস্কার ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন এবং কিছু বিতর্কিত নিরাপত্তা আইন বাতিলও করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে এক ‘বিচ্ছিন্ন অভিজাত’ নেতায় পরিণত হন।
২০১৫ সালে পণ্য ও সেবা কর (জিএসটি) চালু করায় ব্যাপক জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়, যা পরে বাতিল করা হয়। একই সময়ে ১এমডিবি তহবিল থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিখোঁজ হওয়ার তথ্য প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে বিরোধীদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে নাজিব ক্ষমতা হারান। এরপর থেকেই নাজিব ও তার স্ত্রী রোসমাহ মনসুরের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির মামলা সামনে আসে।
নাজিবের স্ত্রী রোসমাহ মনসুরও বিলাসী জীবনযাপনের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, তার চুল সাজাতেই খরচ হতো ১ হাজার ২০০ রিঙ্গিত, যেখানে সে সময় দেশটির ন্যূনতম মাসিক মজুরি ছিল মাত্র ৯০০ রিঙ্গিত।
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ দাবি করেন, ২০১৫ সালে নাজিব তাকে বলেছিলেন— রাজনীতিতে টিকে থাকতে নগদ অর্থই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিরোধীরা এই মন্তব্যকে নাজিবের দুর্নীতি ও ক্ষমতার দম্ভের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।
এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে ফ্রান্স থেকে সাবমেরিন কেনার চুক্তি ও সেই সংক্রান্ত ঘুষের অভিযোগেও নাজিবের নাম জড়ায়। ওই ঘটনায় এক মঙ্গোলীয় নারী হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, যদিও নাজিব এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
মার্কিন তদন্তে জানা যায়, ১এমডিবি তহবিলের অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বিলাসবহুল সম্পত্তি, দামি শিল্পকর্ম, ব্যক্তিগত জেট এবং হলিউডের সিনেমা দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট নির্মাণে ব্যয় করা হয়। এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও ২০২০ সালে একটি মামলায় নাজিব দোষী সাব্যস্ত হন এবং ১২ বছরের কারাদণ্ড পান, যা পরে কমিয়ে ছয় বছর করা হয়।
বর্তমানে ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা মামলাটি নাজিব রাজাকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে দোষী সাব্যস্ত হলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং অবশিষ্ট প্রভাব বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
একসময় যিনি ছিলেন মালয়েশিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা, আজ তিনি দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।

