ভালোবাসা, সংগ্রাম আর সত্যের পথে এক তরুণীর গল্প
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:মুনতাসিম সরকার সৌরভ
রাতের নিস্তব্ধতা ও কলমের আলো
রংপুরের আকাশে রাতের অন্ধকার নেমেছে, কিন্তু আইশা খান-এর ঘর এখনও আলোয় ভরা। হাতে কলম অচঞ্চল, চোখে একরাশ মনোযোগ। ল্যাপটপের পাশে রাখা নোটবুক খুলে তিনি লিখছেন মানবাধিকার, নারীর শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, এবং সমাজকে স্পর্শ করা ছোট ছোট ঘটনা।
“আমি চাই আমার লেখা কারও জীবনে আলোর এক ছোট ঝলক জ্বালাতে পারে,” বললেন তিনি। রাতের নিস্তব্ধতায় এই শব্দগুলো যেন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আইশার লেখার প্রতি ভালোবাসা শুধু হবি নয়; এটি তার জীবনধারা। রাতের নিস্তব্ধতায় এই ছোট্ট ঘরে যেন বিশ্বকে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত একটি কলম বসে আছে।
ছোট শহর থেকে বড় স্বপ্নের পথে
রংপুরের ছোট শহরে বেড়ে ওঠা আইশা খান-এর শৈশবকাল সহজ ছিল না। পড়াশোনা, পরিবার ও সমাজ সবক্ষেত্রেই মেয়েদের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা ছিল।ছোটবেলাতেই বই, গল্প এবং মানুষের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা দেখার মাধ্যমে তিনি নিজেকে আলাদা দেখতে শিখেছিলেন।
“স্কুলজীবনে আমি দেয়াল পত্রিকায় লেখালিখি করতাম। তখন থেকেই মনে হয়েছিল, গল্পের ভেতর সত্য বলার এক শক্তি আছে,” অভিজ্ঞতার সঙ্গে বললেন তিনি।
পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগে। এখানে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হলো বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। প্রতিটি ক্লাস, ওয়ার্কশপ ও প্রজেক্টের মধ্য দিয়ে তিনি শিখছেন কিভাবে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কলম চালানো যায়।
সাংবাদিকতার প্রতি ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা
শুরুতে সাংবাদিকতার প্রতি উৎসাহ ছিল কেবল আগ্রহ, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে দায়িত্ব ও অনুপ্রেরণার পথ।
“সাংবাদিকতা আমার কাছে কেবল পেশা নয়। এটি এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমি চাই মানুষ জানুক, বুঝুক, ভাবুক,”—বললেন আইশা খান।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং মিডিয়ার দায়িত্ববোধ নিয়ে। এসব প্রশিক্ষণ তাকে শিক্ষিত করাই নয়, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে সমাজ ও সাংবাদিকতার প্রতি।
সংগ্রাম এবং আত্মপ্রত্যয়
আইশা জানালেন, শুরুতে পরিবার ও সমাজে সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক দ্বিধা ছিল।
“মেয়েরা মাঠে কাজ করবে, খবর সংগ্রহ করবে অনেকে এটা সহজভাবে নিতে পারতেন না। কিন্তু আমি চুপ করে থাকিনি। আমি বিশ্বাস করি, নীরব থাকা মানে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো।”
শুরুর লড়াই চ্যালেঞ্জিং ছিল। পরিবার উদ্বিগ্ন, বন্ধুরা বিভ্রান্ত। কিন্তু আইশা আত্মবিশ্বাসী। কঠিন সময়ে তিনি নিজের লক্ষ্য মনে রাখতেন মানুষের জন্য সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে লেখা।
“প্রথম বার যখন আমার লেখা প্রকাশিত হলো, বাবা-মা খুব খুশি হয়েছেন। তখন বুঝতে পারলাম, সাহসিকতা কখনও বৃথা যায় না।”
কলমে স্বপ্ন, চোখে আলোর বিশ্বাস
আইশা-র ঘর যেন তার নিজের ছোট সংবাদকক্ষ। ডেস্কে ছড়িয়ে আছে নোটবুক, রঙিন হাইলাইটার, ক্যামেরা, আর পাশে একটি কাপ চা। প্রতিটি শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে তার বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ এবং অনুভূতি।
“আমি চাই পাঠক শুধু খবর না পড়ুক, অনুভব করুক। যে গল্পটি আমি লিখছি, তা যেন তাদের মনে দাগ কাটে।”
তার লেখার মূল বিষয়গুলো ঘুরে ফিরে আসে সমাজের প্রান্তিক মানুষ, নারীর স্বীকৃতি, তরুণদের সম্ভাবনা, এবং সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা। আইশা মনে করেন, কলম হলো মানুষের কণ্ঠ। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সেই কণ্ঠকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা।
প্রেরণা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আইশা-র গল্প শুধু একটি তরুণীর নয়। এটি নতুন প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি, যারা বিশ্বাস করে ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং সত্য একসাথে পথ দেখাতে পারে।
“একজন সাংবাদিকের কলম কেবল খবর লেখে না, মানুষের গল্প লিখে। সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমরা সমাজে পরিবর্তন আনতে পারি,” শেষে এভাবেই বললেন তিনি।
তার চোখে এখনো স্বপ্ন উজ্জ্বল। ভবিষ্যতে তিনি চান, তার লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলুক, শিক্ষিত তরুণদের অনুপ্রাণিত করুক, এবং বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়ন ও স্বাধীন চিন্তার পথ প্রশস্ত করুক।

