নির্বাচন ও জোট রাজনীতি: এনসিপির সংকট ও নতুন বন্দোবস্তের প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
আপডেট: ৭ জানুয়ারি ২০২৬
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোট রাজনীতি, মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও নতুন দল এনসিপির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গণ–অভ্যুত্থানের প্রায় ১৮ মাস পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে সেই আন্দোলনের আদর্শ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
মুক্তিযুদ্ধের পর কিংবা ১৯৯০ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আন্দোলনের স্মৃতি ও রাজনৈতিক আবহ স্পষ্ট থাকলেও এবারের নির্বাচনী আলোচনা ও প্রচারণায় ‘৩৬ জুলাই’-এর রক্তস্নাত প্রত্যাশা অনুপস্থিত বলেই মত বিশ্লেষকদের। তবে এবারের নির্বাচনে গণভোট যুক্ত হওয়াকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তৃণমূল উপেক্ষিত
মনোনয়নপত্র জমাদানের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া এক ধাপ এগোলেও দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন নির্ধারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অল্প কয়েকজন নেতা প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলভিত্তিক মনোনয়নের দাবি থাকলেও নির্বাচনী বিধির সেই নির্দেশনা বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
জোট গঠনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত, অংশগ্রহণের ঘাটতি
মনোনয়নের পাশাপাশি জোট গঠন ও ভাঙনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির জোট পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দলটির একাংশের দাবি, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কেন্দ্রীয় অনেক নেতাই আগে অবগত ছিলেন না।
এতে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নাগরিক সমাজের একটি অংশ মনে করছে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে প্রত্যাশা এনসিপিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে পূরণ হয়নি।
জামায়াতের সঙ্গে জোট: বাস্তবতা না আদর্শচ্যুতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির জামায়াতমুখী জোট রাজনীতি অনেকের কাছে অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দলটির ভেতরে শুরু থেকেই দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক ঝোঁক ছিল এবং গত ১৭ মাসে সরকারকে সংস্কার প্রশ্নে চাপ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দলটি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে এসেছে, ততই এনসিপির অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় দলটি নির্বাচনের পর রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে জামায়াত–নেতৃত্বাধীন জোটকে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক পথ হিসেবে বেছে নেয় বলে মত বিশ্লেষকদের।
আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
জোটের শর্ত অনুযায়ী, এনসিপিকে তাদের নির্ধারিত আসনের বাইরেও ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রকল্পের পক্ষে প্রচারণা চালাতে হবে। তবে এতদিন ধরে যে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’-এর কথা বলে আসছিল দলটি, সেই লক্ষ্য ও জামায়াতের রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে আদর্শগত সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই জোট রাজনীতি এনসিপির ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে এবং গণ–অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক রাজনীতির শক্তি ও ভাবমূর্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
নির্বাচন ও জোট রাজনীতি: এনসিপির সংকট ও নতুন বন্দোবস্তের প্রশ্ন
প্রকাশ:

