আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাস গড়ে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। আজ বুধবার এই রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ শিগগিরই সুদের হার কমাবে—এমন প্রত্যাশাও স্বর্ণের দামে জোয়ার তুলেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, আজ বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে স্পট গোল্ড তথা তাৎক্ষণিকভাবে খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ১৭ দশমিক ১৬ ডলার, যা আগের দিনের চেয়ে দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। ডিসেম্বরে সরবরাহযোগ্য যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার (যেসব স্বর্ণ এখন চুক্তি হবে কিন্তু ভবিষ্যতে সরবরাহ করা হবে) চুক্তিতেও দাম বেড়ে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৪০ ডলারে পৌঁছেছে।
স্বর্ণকে বরাবরই অস্থির সময়ে নিরাপদ সম্পদ মনে করা হয়। চলতি বছর সেটিই আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। গত বছরও এর দাম বেড়েছিল ২৭ শতাংশ। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এত দ্রুত ও ধারাবাহিক বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলার ছোঁয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
স্বাধীন ধাতু ব্যবসায়ী তাই ওয়াং বলেছেন, বাজারে এখন এই লেনদেনকে ঘিরে অগাধ আস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, ‘ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর ধারা অব্যাহত রাখবে এবং সেটিই স্বর্ণের দামকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয় কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধের বড় কোনো অগ্রগতি হয়, তাহলে সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমতে পারে।’ যদিও মূল কারণগুলো—বিশাল ঋণের বোঝা, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা এবং দুর্বল মার্কিন ডলার—মধ্য মেয়াদে বদলানোর সম্ভাবনা নেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, একাধিক কারণে এবার স্বর্ণের দাম এতটা বেড়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার কমানোর প্রত্যাশা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তিশালী ক্রয়, স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে বিনিয়োগ এবং দুর্বল ডলার—সব মিলিয়েই এই উল্লম্ফন ঘটেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে টানা সাত দিন ধরে চলছে সরকার বন্ধ। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিনিয়োগকারীরা সরকারি তথ্যের বদলে বিকল্প তথ্যের ওপর নির্ভর করছেন, যাতে ফেড কতটা ও কখন সুদ কমাবে, সে ধারণা পাওয়া যায়। বাজার এখন প্রায় নিশ্চিত যে, ফেড অক্টোবরের বৈঠকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমাবে। ডিসেম্বরে আরও এক দফা সমপরিমাণ কমানো হতে পারে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেছেন, ‘অনিশ্চয়তা বাড়লেই সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ে। এবারও সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে।’ তাঁর মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সুদ কমানো এবং সরকার বন্ধের কারণে স্বর্ণের পক্ষে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ তবে তিনি সতর্ক করেছেন, আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ডলার ছোঁয়ার পর অনেকে লাভ তুলে নিতে চাইতে পারেন, যা স্বল্পমেয়াদে দাম কমার ঝুঁকি তৈরি করবে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে বা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’-এর কারণে চাহিদা আরও বাড়ছে। এর সঙ্গে ফ্রান্স ও জাপানের রাজনৈতিক টানাপোড়েনও স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। গত সপ্তাহে জাপানে সানায়ে তাকাইচি ক্ষমতাসীন দলের প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পর দেশটিতে ঘাটতিভিত্তিক ব্যয় আরও বাড়তে পারে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের অন্যতম বড় থিম, যাকে বলা হচ্ছে ‘রান ইট হট’ ট্রেড।
আগামী বছরগুলোতেও স্বর্ণের দাম উঁচুতে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে শক্তিশালী বিনিয়োগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার আরও কমানোর সম্ভাবনা বাজারকে চাঙা রাখবে। এ জন্য বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস ও ইউবিএস স্বর্ণের দাম পূর্বাভাস বাড়িয়েছে।
শুধু স্বর্ণ নয়, অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও দাম বেড়েছে। স্পট সিলভারের দাম বেড়ে হয়েছে আউন্সপ্রতি ৪৮ দশমিক ৪৪ ডলার, যা আগের দিনের চেয়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। প্লাটিনামের দাম বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৫৭ দশমিক ৩৩ ডলার, যা ২ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। আর প্যালাডিয়ামের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬৮ দশমিক ৬৮ ডলার, যা ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

