মানবাধিকারের চর্চা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাকি বাস্তবে?

প্রকাশ:

মানবাধিকারের চর্চা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাকি বাস্তবে?

মুনতাসিম সরকার সৌরভ

ডিজিটাল যুগে মানবাধিকার এখন কেবল আইনি বা নীতির বিষয় নয়—এটি হয়ে উঠেছে অনলাইন আলোচনার অন্যতম জনপ্রিয় বিষয়। কোথাও অন্যায় ঘটলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের ঢেউ। কেউ লেখেন স্ট্যাটাস, কেউ বদলান প্রোফাইল ফ্রেম, আবার কেউ ব্যবহার করেন ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বিশ্বাস করেন—একটি পোস্টই পারে সমাজ বদলে দিতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই মানবাধিকারের চর্চা করছি, নাকি কেবল ভার্চুয়াল করতালির জন্য অভিনয় করছি?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিঃসন্দেহে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) বা ইনস্টাগ্রাম প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে সহজেই পৌঁছে দিচ্ছে মূলধারার আলোচনায়। বাংলাদেশেও দেখা গেছে, অনলাইনে শুরু হওয়া কিছু আন্দোলন পরবর্তীতে ন্যায়ের দাবিতে বাস্তব আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। নারী অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন বা শিক্ষার বৈষম্যের মতো ইস্যুতেও সোশ্যাল মিডিয়া তরুণদের একত্রিত করছে।

তবে সমস্যা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ থাকে ‘ক্লিক’ বা ‘শেয়ার’-এর মধ্যেই। কেউ পোস্ট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন, কেউ ‘লাইক’ দিয়ে শান্তি পান। এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘স্ল্যাকটিভিজম’—অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় অ্যাকটিভিজম। এতে সাময়িক সচেতনতা তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের পথে তা খুব একটা ভূমিকা রাখে না। স্ক্রিনের বাইরে সমাজে যে বৈষম্য, সহিংসতা বা অন্যায় চলছে—তার বিরুদ্ধে তখন নীরবতা নেমে আসে।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজেও অনেক সময় মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। অনলাইন হয়রানি, ঘৃণাবাচক মন্তব্য, নজরদারি, কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনা এখন নিয়মিত। ফলে যে প্ল্যাটফর্মে আমরা মানবাধিকারের কথা বলি, সেখানেই প্রায়ই সেই অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।

মানবাধিকারের আসল চর্চা শুরু হয় স্ক্রিনের বাইরে—যখন আমরা গৃহকর্মীর প্রতি সম্মান দেখাই, কর্মস্থলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, বা কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই নিঃস্বার্থভাবে। মানবাধিকার শুধু আইনের ভাষা নয়; এটি মানুষের বিবেক, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ।

বিশ্ববিদ্যালয়, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের এখনই উচিত তরুণদের এমনভাবে অনুপ্রাণিত করা, যাতে অনলাইন সচেতনতাকে তারা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হোক সচেতনতার সূচনা, কিন্তু পরিবর্তন আসুক বাস্তবে—মানুষের আচরণে, মননে এবং ব্যবহারে।

কারণ সত্যিকারের মানবাধিকার চর্চা হয় না ফেসবুকের মন্তব্যে, হয় মানুষের অন্তরে—যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জন্ম নেয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়

আরও পড়ুন

ঈমান ছাড়া কোনো আমলে আত্মা শুদ্ধ হয় না।

ঈমান ছাড়া কোনো আমলে আত্মা শুদ্ধ হয় না। একমাত্র...

মানবতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইনসানিয়াত বিপ্লবের ৪৯ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা

মানবতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইনসানিয়াত বিপ্লবের ৪৯ দফা নির্বাচনী ইশতেহার...

গাজীপুর-২ আসনে ইনসানিয়াত বিপ্লবের গণসংযোগ

গাজীপুর-২ আসনে #আল্লামাইমামহায়াত, প্রবর্তিতইনসানিয়াত বিপ্লবের গণসংযোগ করেনইনসানিয়াত বিপ্লব মনোনীত প্রার্থীএডভোকেট...